লেখক: মোঃ মনিরুল ইসলাম।
কেউ যখন জানতে পারে যে তার হাতে আর মাত্র অল্প কিছু সময় বাকি, তখন অধিকাংশ মানুষ ভেঙে পড়ে। কেউ হতাশ হয়ে যায়, কেউ নিজের ভাগ্যকে অভিশাপ দেয়। কিন্তু পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা মৃত্যুর সংবাদকেও আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ নিয়ামত হিসেবে গ্রহণ করেন। আলী বানাত ছিলেন তেমনই একজন মানুষ।
ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান ব্যবসায়ী আলী বানাত ছিলেন ধন-সম্পদ, বিলাসিতা ও প্রাচুর্যের প্রতীক। দামি স্পোর্টস কার, অভিজাত বাড়ি, ব্র্যান্ডের পোশাক—সবই ছিল তাঁর জীবনের অংশ। বাহ্যিক দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন সফলতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। কিন্তু মহান আল্লাহ তাঁর জন্য অন্য এক পথ নির্ধারণ করেছিলেন।
২০১৫ সালে চিকিৎসকেরা জানালেন, তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত। তাঁর হাতে হয়তো আর খুব বেশি সময় নেই। এই সংবাদ অনেকের জীবনকে অন্ধকারে ডুবিয়ে দিতে পারত। কিন্তু আলী বানাত বলেছিলেন একটি অবিস্মরণীয় কথা—
“I have been gifted with cancer.”
“আল্লাহ আমাকে ক্যান্সারের উপহার দিয়েছেন।”
এটি কোনো হতাশ মানুষের কথা ছিল না; বরং এমন এক ঈমানদার হৃদয়ের কথা, যে বুঝতে পেরেছিল—এই দুনিয়া চিরস্থায়ী নয়। আল্লাহ তাঁকে সময় শেষ হওয়ার আগেই নিজের দিকে ফিরে আসার সুযোগ দিয়েছেন।
তিনি নিজের জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে ফেললেন। বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে তিনি দরিদ্র মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করলেন। নিজের সম্পদ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করলেন। আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিশুদ্ধ পানির কূপ, এতিমদের আশ্রয়, শিক্ষা, খাদ্য, চিকিৎসা ও জীবিকার ব্যবস্থা করতে শুরু করলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত Muslims Around The World (MATW) আজও হাজার হাজার মানুষের জীবন বদলে দিচ্ছে।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন—
«”তোমরা কখনোই প্রকৃত কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে আল্লাহর পথে ব্যয় কর।”
— সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৯২»
আলী বানাত এই আয়াতকে যেন নিজের জীবনে বাস্তব রূপ দিয়েছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, মৃত্যুর সময় ব্যাংক ব্যালেন্স, দামি গাড়ি কিংবা বিলাসবহুল বাড়ি কোনো কাজে আসবে না। সঙ্গে যাবে কেবল ঈমান, আমল এবং মানুষের জন্য রেখে যাওয়া উপকার।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
«”মানুষ মারা গেলে তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি আমল চলতে থাকে—সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।”
(সহিহ মুসলিম)»
আলী বানাতের প্রতিষ্ঠিত মানবিক প্রকল্পগুলো আজও মানুষের উপকার করছে। তাই আশা করা যায়, তাঁর সদকায়ে জারিয়ার সওয়াব আল্লাহর ইচ্ছায় অব্যাহত থাকবে।
২০১৮ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। কিন্তু তাঁর বিদায়ে তাঁর মিশনের সমাপ্তি ঘটেনি। বরং তাঁর জীবনকাহিনি পৃথিবীর লাখো মানুষের হৃদয়ে পরিবর্তনের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। অনেকেই তাঁর জীবন দেখে দান-সদকা শুরু করেছেন, মানবসেবায় এগিয়ে এসেছেন এবং দুনিয়ার মোহ ছেড়ে আখিরাতের প্রস্তুতি নেওয়ার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছেন।
আজ আমরা নিজেদের কাছে একটি প্রশ্ন রাখতে পারি—যদি আজ জানতে পারি আমাদের জীবন আর খুব বেশি বাকি নেই, তাহলে আমরা কী করব? আমরা কি শুধু আফসোস করব, নাকি আলী বানাতের মতো অবশিষ্ট সময়টুকু আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মানবকল্যাণে ব্যয় করব?
জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত। সম্পদ, পদ-পদবি, ক্ষমতা—সবই একদিন রেখে যেতে হবে। কিন্তু মানুষের মুখে ফোটানো একটি হাসি, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো একটি হাত, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা একটি দান—এসবই মৃত্যুর পরও আমাদের জন্য আলো হয়ে থাকবে।
আলী বানাত আমাদের শিখিয়েছেন—মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা নয়; বরং মৃত্যুর আগেই এমন কিছু রেখে যাও, যা তোমার মৃত্যুর পরও মানুষকে উপকার করবে।
আল্লাহ তাআলা আলী বানাতকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন এবং আমাদেরকেও তাঁর মতো আন্তরিকভাবে দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করে আখিরাতের জন্য কাজ করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
